Breaking News

ছাত্রলীগে সাংগঠনিক শৃঙ্খলার বালাই নেই

করোনাভাইরাস মহামারীকালে ধানকাটা ও মানবিক কর্মসূচি দিয়ে প্রশংসিত হলেও ছাত্রলীগে কোনো শৃঙ্খলা নেই। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডও স্থবির হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কোনো পর্যায়েই সম্মেলন করা হয় না। তবে রীতি ও নির্দেশনা অমান্য করে শুধু সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ‘মনগড়া’ কমিটি দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির ছড়াছড়ি।

এক বছর আগে বর্তমান শীর্ষ দুই নেতা (সভাপতি-সাধারণ) ভারমুক্ত হলেও দায়িত্বে আসার পর দিবসভিত্তিক কর্মসূচি পালনে দু-একটি প্রস্তুতি সভা করেছেন। তবে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির কোনো সভা হয়নি। টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়ার সময়ও তাদের হয়ে ওঠেনি। আজ-কাল করে কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও অর্ধশতাধিক কেন্দ্রীয় পদ পূরণ হয়নি। কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে সাংগঠনিক দায়িত্বও বণ্টন করা হয়নি। এ অবস্থার মধ্যে ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছে উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন।

জানতে চাইলে ছাত্রলীগ সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় রোববার সন্ধ্যায় যুগান্তরকে বলেন, আমাদের সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে প্রায় সবই মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল। এগুলোর সম্মেলন আয়োজনে আমাদের আন্তরিকতার ঘাটতি ছিল না। কিন্তু করোনার কারণে সম্মেলন করা সম্ভব হয়নি। তবুও আমরা ১১টি জেলায় কমিটি করেছি। সম্মেলন করা আমাদের একমাত্র কাজ নয়। শিক্ষার্থীদের অধিকার এবং তাদের সমস্যা সমাধান করা আমাদের প্রধান কাজ। তিনি বলেন, শূন্য পদগুলো দু-একদিনের মধ্যে পূরণ করা হবে। নির্বাহী কমিটির মিটিং প্রসঙ্গে তিনি বলেন, করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। তখন কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকে যে যার এলাকায় চলে গিয়েছিলেন। তবে ছাত্রলীগ সভাপতির এমন বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির অনেক নেতা। তাদের দাবি-শোভন-রাব্বানীর পর একটা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ছাত্রলীগের দায়িত্বে আসেন আল নাহিয়ান খান জয় ও লেখক ভট্টাচার্য। কিন্তু দায়িত্ব পাওয়ার পর সংগঠনের শৃঙ্খলা ফেরাতে তারা ‘ব্যর্থ’ হয়েছেন। কেন্দ্রীয় কমিটির অন্য নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে তারা কোনো কাজ করেননি। কাউকে কোনো দায়িত্ব না দিয়ে সবকিছু তারা নিজেদের হাতে রেখেছেন। পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘স্বেচ্ছাচারীভাবে’ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে।

জানতে চাইলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি সোহান খান যুগান্তরকে বলেন, প্রতিবছর কেন্দ্রীয় নেতাদের দায়িত্ব বণ্টন করা হয়। কিন্তু এবার এখনো সেটা করা হয়নি। আসলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটিকে কোনো কাজে লাগানো হয়নি। এবার সব কাজ তারা (সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক) নিজেরা করার চেষ্টা করেছেন। তারা অনেকটা স্বেচ্ছাচারীভাবে সবকিছু করেছেন। তিনি আরও বলেন, সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জেলা কমিটিগুলো করা হয়েছে। অথচ করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যেও জয়পুরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়েছে। জামালপুরে যুবলীগের সম্মেলন হয়েছে। তাহলে ছাত্রলীগ কেন সম্মেলন করতে পারবে না? কেন কেন্দ্রে বসে মহামারির অজুহাতে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কমিটি দেবে?

ছাত্রলীগের ২৯তম জাতীয় সম্মেলনের পর ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই সভাপতি পদে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক পদে গোলাম রাব্বনীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, স্বজনপ্রীতিসহ নানা অভিযোগে পূর্ণাঙ্গ মেয়াদে দায়িত্ব পালনের আগেই ২০১৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করতে তারা বাধ্য হন। এরপর সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পান আল নাহিয়ান খান জয় এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান লেখক ভট্টাচার্য। তিন মাস ভারপ্রাপ্ত থাকার পর ছাত্রলীগের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তাদের পূর্ণ দায়িত্ব দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

দায়িত্ব পাওয়ার পর শীর্ষ দুই নেতা সংগঠন গোছানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ছাত্রলীগের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ। সারা দেশে সংগঠনটির ১১১টি সাংগঠনিক জেলা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণসহ প্রায় সবকটি মেয়াদ উত্তীর্ণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল কমিটিও হয়নি। কোনো কোনো ইউনিটের কমিটির মেয়াদ ৮-৯ বছর আগে শেষ হয়েছে। এভাবে বছরের পর বছর সাংগঠনিক ইউনিটগুলোর কমিটি না করেই চলছে ছাত্রলীগ।

জানা গেছে, জয়-লেখকের সময়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কুষ্টিয়া, নড়াইল, কিশোরগঞ্জ, চাঁদপুর, কক্সবাজার ও গোপালগঞ্জসহ ১১টি জেলা কমিটির আংশিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আবার এসব কমিটি গঠনে কেন্দ্রীয় কমিটির অন্য নেতাদের সঙ্গে আলোচনা বা সমন্বয়ও করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান আল ইমরান যুগান্তরকে বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বর্তমান কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। নিয়ম অনুযায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তিন মাস আগে সাধারণ সভা করতে হয়। সেটাও করা হয়নি।

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতিমাসে একবার ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের মিটিং করার বিধান রয়েছে। দীর্ঘ সময়ে দিবসভিত্তিক কর্মসূচি পালনে দু-একটা প্রস্তুতি সভা হলেও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভা হয়নি। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। তারা বলছেন, সংগঠনের মাসিক সভায় সমস্যা ও সম্ভবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়। সাংগঠনিক কর্মপরিকল্পনাও তৈরি হয়। অথচ মাসিক সভা তো দূরের কথা, কার্যনির্বাহী সংসদের সিনিয়র সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে না। সংগঠনের দুই শীর্ষ নেতার এমন কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে শীর্ষ পদধারীরাও। কেন্দ্রীয় কমিটির এক নেতা বলেন, জয়-লেখকের নেতৃত্বে একটিও মাসিক সভা হয়নি। কোনো দায়িত্বও দেওয়া হয়নি। কোনো বিষয়ে কারও সঙ্গে সমন্বয়ও করা হয়নি। আমাদের শুধু নামে পদ; কিন্তু কোনো কাজ নেই।

গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর থেকে ২১ ডিসেম্বরের মধ্যে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখার নেতাদের হাতে চার নেতানেত্রী মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো বিচার হয়নি। এ নিয়ে ছাত্রলীগের ভেতরে চলছে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ।

কর্মসূচি : দিবসটি উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে ছাত্রলীগ। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে-সকাল সাড়ে ৭টায় সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সাড়ে ৮টায় ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং কার্জন হলে কেক কাটা। সকাল ১০টায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের প্রতিনিধি দল টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করবে। বিকাল ৩টায় ছাত্রলীগের ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উদ্বোধন করা হবে। বিকাল ৪টায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন আওয়ামী লীগের দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা।

Check Also

Amnesty and HRW urge Bangladesh to immediate release Mir Ahmad, Amaan Azmi

Two human rights organizations – Amnesty International and Human Rights Watch – have urged Bangladesh …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *