Breaking News
Home / বাংলাদেশ / এক নারীর মিথ্যা জবানবন্দিতেই নিঃশেষ পরিবারটি

এক নারীর মিথ্যা জবানবন্দিতেই নিঃশেষ পরিবারটি

নারায়ণগঞ্জে অপহরণ মামলায় তথাকথিত ‘খুন হওয়ার’ ৬ বছর পর ফিরে এসেছেন মামুন নামে এক ভিকটিম। একজন নারীর সাক্ষীর ওপর ভিত্তি করেই এক পরিবারের ৬ সদস্যকে পোহাতে হয়েছে রিমান্ডের অকথ্য নির্যাতন আর এলাকা ছাড়ার মতো পরিস্থিতির।

৬ বছর পর ফিরে আসা মামুনের কথিত প্রেমিকা তাসলিমার মামি ও মামলার আসামি সাত্তার মোল্লার স্ত্রী মাকসুদাই ছিলেন এই চাঞ্চল্যকর মামলার একমাত্র সাক্ষী; যার জবানবন্দির কারণেই ৬ জন তদন্তকারী কর্মকর্তার হাতে বারবার নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে নিরাপরাধ ৬ জন আসামিকে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ১০ মে মামুন নিখোঁজ হলেও ওই বছর অনেকটা নীরবই ছিল নিখোঁজ মামুনের পরিবার। তবে ২ বছর পরে একই পরিবারের ৬ জনের নাম উল্লেখ করে ফতুল্লা মডেল থানায় অপহরণ মামলা দায়ের করেন নিখোঁজ মামুনের বাবা আবুল কালাম।

ওই মামলায় আবুল কালাম অভিযোগ করেন, তার ছেলে মামুনের সঙ্গে একই গ্রামের রকমত আলীর মেয়ে তাসলিমা খাতুনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এতে তাসলিমার বড় ভাই রফিক প্রতিবাদ করেন।

ওই মামলায় মামুনকে কোমলপানীয়র সঙ্গে চেতনানাশক সেবনের মাধ্যমে অচেতন করে অপহরণ ও গুম করা হয়েছে অভিযোগ এনে মামলায় ৬ জনকে বিবাদী করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে মামুনকে অপহরণের পর গুমের অভিযোগ করা হয়েছিল।

বিবাদীরা হলেন- প্রেমিকা তাসলিমা, তার বাবা রকমত, ভাই রফিক, দুই খালাতো ভাই সাগর ও সোহেল এবং মামা সাত্তার মোল্লা।

এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে স্বীকারোক্তি প্রদানের জন্য মাকসুদা বেগমকে আদালতে হাজির করেন মামলার প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা ফতুল্লা মডেল থানার এসআই মিজানুর রহমান।

প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়া মাকসুদার স্বামী সাত্তার মোল্লাও ওই মামলার ৫ নম্বর এজাহার নামীয় আসামি ছিলেন। ২০১৬ সালের ৯ মে যেদিন ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা দায়ের করা হয় সেনিই প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আদালতে সাক্ষী দেন মাকসুদা বেগম (৩২)।

মাকসুদা চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তরের শাখারীপাড়া এলাকার সাত্তার মোল্লার স্ত্রী। তারা ফতুল্লার লামাপাড়া এলাকার আকতারের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন।

প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষীতে মাকসুদা উল্লেখ করেছেন, মামুনকে অপহরণ করে তাসলিমার খালার ভাড়া বাসায় কোমলপানীয়র সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে তাকে হত্যা করে শীতলক্ষ্যা নদীতে গুম করা হয়েছে।

মামলার ৬ আসামিকে বারবার রিমান্ডে আনলেও গ্রেফতারকৃতরা কেউই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি। পরে মামলাটি ফতুল্লা মডেল থানা থেকে প্রথমে ডিবিতে এবং পরবর্তীতে সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়।

পরে সিআইডির দেয়া চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৪ সালের ১০ মে খালাতো বোন তাসলিমাকে দিয়ে কৌশলে মামুনকে বাড়ি ডেকে আনা হয়। পরবর্তীতে মামনুকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় তাসলিমা কিন্তু বিয়েতে রাজি না হওয়াতে বিবাদী ৬ জন মিলে মামুনকে কোমলপানীয়র সঙ্গে চেতনানাশক দ্রব্য খাইয়ে অচেতন করে সিএনজিচালিত অটোরিকশা করে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। তবে কোথায় কীভাবে কী অবস্থায় রাখা হয়েছে সেটা জানা যায়নি।

এদিকে অপহরণ ও গুমের মামলার ৬ বছর পর নিজেই আদালতে হাজির হয়েছেন কথিত অপহৃত যুবক মামুন।

অথচ পুলিশ তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, ওই অপহৃতকে হত্যার পর লাশ গুম করে শীতলক্ষ্যায় ফেলে দেয়া হয়েছে।

আর সিআইডি তাদের দেয়া চার্জশিটে বলেছেন, ওই যুবককে অপহরণ করা হয়েছে। ওই ঘটনায় একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আদালতে সাক্ষ্যও দিয়েছেন মাকসুদা। এসব কারণে গত ৪ বছর ধরেই মামলার আসামি হয়ে বিভিন্ন সময়ে কারাভোগ ও রিমান্ডের শিকার হয়েছেন খালাতো বোন ও তার বাবাসহ একই পরিবারের ৬ জন।

মামলাটির বিচারকাজও সম্পন্নের পথে ছিল। এ অবস্থায় গত বুধবার নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ায় কথিত অপহৃত হাজির হলে দেখা দেয় চাঞ্চল্য।

তবে মামলার প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তার দাবি ছিল, প্রত্যক্ষদর্শী মাকসুদার তথ্যের ভিত্তিতেই নিখোঁজ মামুনের পরিবার চাঁদপুর থেকে নারায়ণগঞ্জে এসে মামলা দায়ের করেন। পরে মাকসুদা আদালতে স্বীকারোক্তি দিলে সেই সূত্র ধরেই অপহরণের পরে গুমের মামলার তদন্ত চলেছে।

এতদিন কোথায় ছিলেন কীভাবে ছিলেন বাড়ি থেকে কেন পালিয়ে গিয়েছিলেন- জানতে চাইলে মামুন বলেন, কাজকর্মের কথা বলায় অভিমান করে বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলাম। এত বছর বাড়িতে কোনো যোগাযোগ করিনি। রাজশাহী নাটোর বিভিন্ন জায়গায় থেকে ছোটখাটো কাজ করেছি। হোটেলে কাজ করেছি। আমি জানতাম না মামলা করা হয়েছে।

বাড়িতে এসে শুনলাম মামলার কথা। যাদের আসামি করা হয়েছে তাদের সঙ্গে তেমন কোনো সম্পর্ক ছিল না। পাড়া-প্রতিবেশী ছিল। মেয়ের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না। এমনিতেই বান্ধবী ছিল। কী কারণে মামলা করেছে সেটা আমার পরিবার জানে।

এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার বিকালে নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আফতাবুজ্জামানের আদালত মামলার এজাহার থেকে চার্জশিট পর্যন্ত পুলিশ ও সিআইডির যে ৩ জন কর্মকর্তা তদন্ত করেছেন তাদের ৭ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত তদন্ত প্রতিবেদনসহ আদালতে হাজির হতে বলেছেন।

Check Also

ছাত্রাবাসে নারীকে গণধর্ষণ: আসামি রবিউল মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চেরও সভাপতি

সিলেটের ১২৮ বছরের প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে তার সামনে স্ত্রীকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *